Andaman
আন্দামান ভ্রমন
শুভাশিস দত্ত
© SUBHASIS DUTTA
অনেক দিন পর অনেক ছুটি পেলাম । তাও আবার বাইরে বেরনো যাবে না । মোড়ের দোকান থেকে এগ রোল , চাও না না এক কাপ চা ও না । আরে বাবা বেরনো যাবে না যাবে না । কি আর করি আপনাদের একটা বেড়ানোর অভিজ্ঞতা লিখছি । যেটা বিভিন্ন কারনে সেই সময় লেখা হয়ে ওঠেনি । আমি, আমার স্ত্রী , আমার ছেলে সৌরীশ । যাই হোক তারও অনেক দিন আগে ঠিক হয়ে ছিল ২০২০ জানুয়ারি মাসে আমরা আন্দামান যাব । সেই মত আমরা প্লান করি । প্রথমে আমরা প্লেন এর টিকিট কাটি । তারপর আমরা একটা টুর অপারেটর সঙ্গে চুক্তবদ্ধ হই ।
প্রথম দিনের আগে (09/01/2020) : আমাদের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুসারে রাত্রি বেলায় ট্রেনে হাওড়া যায় । তারপর প্রিপেড ট্যাক্সি করে বিমান বন্দরে যায় । তারপর অধীর আগ্রহে পরের দিনের পোর্ট ব্লেয়ার বিমানের জন্য অপেক্ষা করতে থাকি। পরের দিন সকাল 7 টা 40 মিনিটে আমাদের আকাশ যান নির্ধারিত ছিল ।
প্রথম দিন (10/01/2020) : পোর্ট ব্লেয়ার , সেলুলার জেল কার্বন কোভ বীচ ও লোকাল । এদিন আমরা সকালে বিমানে করে পোর্ট ব্লেয়ার পৌঁছায় সকাল দশটার সময় । সেখানেই ড্রাইভার অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য আমাদের নাম লেখা বোর্ড হাতে । তার পর সেখান থেকে আমরা হোটেলে পৌঁছালাম । সেখানে ব্রেকফাস্ট করে ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ করলাম। তারপর আমরা প্রথমে সেলুলার জেলে গেলাম । কালাপানি র জেল চাক্ষুষ করলাম । খুব ভাল লাগলো । এর পর আমরা কার্বন কোভ বীচ এ গেলাম । এটিও খুব ভাল লাগলো । এখানে আমরা স্পীড বোট (নৌকা ভ্রমন ) করলাম । যেটা আমাদের স্নেক দ্বীপ ঘুরীয়ে আনল । এখান এবং সব জায়গায় লাইফ জ্যাকেট বাধ্যতামুলক । এখানে লাইফ জ্যাকেট ব্যাপারে সবাই খুব সচেতন । এখান থেকে ফেরার সময় আমরা রামকৃষ্ণ মিশন দেখে নিলাম । রামকৃষ্ণ মিশন যেখানে আমরা থাকার কথা চিন্তা করেছিলাম। সেটা দেখার পর আমরা পরে কখন এলে এখানে থাকব সেটা নিশ্চিত করলাম। তারপর পথ মধ্যে একটা স্মৃতি সৌধ দেখে আবার সেলুলার জেলে ফিরে এলাম সন্ধ্যা বেলার লাইট ও সাউন্ড শো দেখার জন্য ।
এখান কার লাইট ও সাউন্ড শো ইতিহাসের পাতা গুলোকে আবার মনে পড়িয়ে দিল । সাভারকার , বটুকেশ্বর দত্তদের । কালাপানির ইতিহাস আবার মন কে স্বাধীনতার আস্বাদ দিল। এরপর হোটেলে ফিরে এলাম । একটু বিস্রাম নিয়ে ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরেরদিন নুতন কিছু দেখার আশাই ।
দ্বিতীয় দিন (11/01/2020) : হ্যাভলক দ্বীপ ।
আজ আমরা সকাল বেলা রাজকীয় ক্রুজে চেপে হ্যাভলক গেলাম । রাজকীয় ক্রুজে ভ্রমন এর অভিঙ্গতা অসাধারন । হ্যাভলক এ নেমে আমরা ব্রেকফাস্ট করে হোটেলের নিজস্ব বিচে গেলাম । তারপর আমরা একটা স্কুটি ভাড়া করে কালাপাথর বিচে ঘুরে এলাম । অসাধারন বিচ ।স্কুটি ভাড়া দিনপ্রতি মাত্র Rs.500/- (পাঁচশত) টাকা মাত্র এবং জালানি পেট্রোল নিজেকে ভরতে হবে। এটা প্যাকেজ মূল্যের অতিরিক্ত । এখানে বলেরাখা ভাল যে ড্রাইভিং লাইসেন্স অতি অবস্যই কাছে থাকতে হবে ।
এরপর ফিরে এসে লাঞ্চ করলাম । তারপর রাধানগর বিচে গেলাম । এটিও খুব সুন্দর বিচ। এখানে ছোট খাটো কেনাকাটার জন্য আদর্শ জায়গা ।
সন্ধ্যার সময় বীচ থেকে ফিরে এলাম । এরপর ... আমরা একটা বেশ নামকরা অন্যরকম সী বীচ রেস্টুরেন্ট এ সান্ধ্যকালীন আহার করলাম । তারপর হোটেলে ফিরে ডিনার করে হোটেল এর নিজস্ব বীচে কিছু সময় কাটালাম । তারপর বিছানা নিলাম ।
তৃতীয় দিন (12/01/2020) : নীল দ্বীপ । আজ আমরা হ্যাভলক দ্বীপ থেকে সকাল সকাল নীল দ্বীপ এর জন্য বন্দর এ এলাম । এখান থেকে আমাদের রাজকীয় ক্রুজ । সেই ক্রুজে চেপে আমরা অসাধারন নীল দ্বীপে এলাম । এখানে এসে আমরা লাঞ্চ করে বিশ্রাম নিলাম । তারপর আমরা ন্যাচারেল ব্রিজ দেখলাম । খুব সুন্দর মনোরম জায়গা । এটি হাওড়া ব্রিজ নামেও পরিচিত । না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। এখান থেকে ফিরে আমরা চলে গেলাম সানসেট বীচে । এখাণে বালির উপর বসে সুন্দর সানসেট বা সূর্যাস্ত দেখলাম । সন্ধ্যার পর আমরা হোটেল এ ফিরলাম । এর পর বিশ্রাম নিলাম ।
চতুর্থ দিন (13/01/2020) : বিশ্রাম । আজ আমাদের রাজকীয় ক্রুজ সকাল দশটার সময় । আমরা সেই মত ব্রেকফাস্ট করে বন্দরে চলে গেলাম । আজ আমাদের কোথাও ঘোরার নেই । ঘন্টা দুই পরে পোর্টব্লেয়ার পৌঁছালাম । সেখান থেকে হোটেলে ফিরে লাঞ্চ করে বিশ্রাম নিলাম । বিকালে হোটেল এর নিকটবর্তী বাজার ঘুরে দেখলাম ।
পঞ্চম দিন (14/01/2020) : রস দ্বীপ ও নর্থ বে দ্বীপ । আজ আমরা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম জলের খেলা করার জন্যে । স্কুভা ড্রাইভিং এর মত জনপ্রিয় বিষয়ের অভিঞ্জতা লাভ লরলাম । প্রথমে আমরা ছোট বোটে করে রস দ্বীপে গেলাম । রস দ্বীপ একদা আন্দামানের রাজধানীর ছিল । এখানকার ব্যবস্থাপনা দেখে মুগ্ধ হলাম । হরিণ ও ময়ূর মন ভরে গেল । কুড়ি টাকার নোটের ছবির বাস্তব জায়গা দেখে অভিজ্ঞ হলাম ।
এরপর আমরা চলে গেলাম নর্থ বে দ্বীপে । এখানে পৌঁছে প্রথমেই স্কুভা ড্রাইভিং করে নিলাম । সে এক অভূত অভিজ্ঞতা । তারপর ডলফিন রাইড করলাম , বেশ সুন্দর । এখানকার পস্তরময় স্বচ্ছ বীচ খুব সুন্দর । এখানে কিছু খাওয়া দাওয়া করে হোটেলে ফিরে লাঞ্চ করলাম।
ষষ্ঠ দিন (15/01/2020) : বারাটাং দ্বীপ , লাইম কেভ ও জাড়োয়া দর্শন । আজ আমাদের অন্যতম বিশেষ আকর্ষন জাড়োয়া জনজাতির আদিম মানুষের প্রকৃতির মাঝে বসবাস দেখা । যদিও সেটা গাড়ীতে যাবার সময় জানালা থেকে যে টুকু দেখা যায় তাই দেখার অনুমতি আছে কেবল মাত্র । আজ আমরা খুব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম । গাড়ী এক ঘন্টার পথ গিয়ে থেমে গেল । কারন জাড়োয়াদের জন্য নির্দিস্ট জায়গায় চেকিং । সেই নির্দিস্ট জায়গায় অনেক বিধি নিষেধ । বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দাঁড়ানো যাবে না । ছবি তোলা যাবে না। মোবাইলেও নয় । যাই হোক বেশ কিছুখন অপেক্ষা করে এখানে কিছু খাবার খেয়ে কনভয় এর সঙ্গে আমাদের গাড়ীও চলতে শুরু করল । আমাদের অধীর আগ্রহ কে নিরাশ করলো । না যাবার সময় কোন জাড়োয়া দেখতে পেলাম না। এর পর শেষ সীমানাই পৌঁছে আমরা একটা খুব বড় সরকারী জাহাজে করে সমুদ্রটা পেরোলাম । খুব বড় জাহাজ মানে এই জাহাজ এ মানুষের সঙ্গে দুটো বাস ট্রাক , চারটে ছোট গাড়িও পের হয়। তারপর ছোটবোটে করে সমুদ্রের গা বেয়ে , ম্যানগ্রোভ বন মধ্যেদিয়ে কাঠের সুন্দর রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে গেলাম । সেখান থেকে আবার প্রায় দুই কিলমিটার দুর্গম রাস্তা হেঁটে লাইম কেভ এ পৌঁছালাম । সেই অপরূপ শোভা বলে বোঝানো যাবে না । লাইম কেভ সুন্দর নক্সা নিজের মত করে গনেশ, শিব , হাতি ইত্যাদি ভেবে নিতে ভালই লাগে । এরপর আমরা আবার একই ভাবে ফিরে এলাম যেখানে ছোট বোটে চেপে ছিলাম । ওখানে লাঞ্চ সেরে নিলাম খুব খিদে পেয়ে ছিল , খুব ভাল লাগলো । তারপর সেই ঢাউস জাহাজে চেপে এপ্রান্তে এসে জাড়োয়া এলাকায় গাড়ী চলতে শুরু করল । না এবারে নিরাশ করল না । রাস্তায় অনেক জাড়োয়া দেখলাম । একদম রাধানগর বীচে কেনা জাড়োয়া মূর্তির মত। মন প্রান ভরে গেল। দীর্ঘ রাস্তার ক্লান্তি নিয়ে হোটেলে ফিরে ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়লাম । পরের দিন ফেরার পালা ।
সপ্তম দিন (16/01/2020) : এ দিন আমাদের শেষ সকাল , এ দিন আমাদের বিমান সকাল 8 টা 30 মিনিটে । এবং ফিরে এলাম কিছু সুন্দর স্মৃতি নিয়ে।
এবার আসি খরচের হিসাবে । আমাদের এই প্যাকেজ মূল্য ছিল Rs.40,500/- (চল্লিস হাজার পাঁচশত টাকা) মাত্র আমরা দুই জন পূর্ন বয়স্ক ও আমাদের ছয় বছরের বাচ্চার জন্য । এর সঙ্গে তিন জনের বিমান ভাড়া যাওয়া ও আসা Rs. 28,500/- (আটাশ হাজার পাঁচশ টাকা) মাত্র ।
আপনাদের মুল্যবান মন্তব্যের অপেক্ষায় থাকলাম ।
Labels: Andaman, Bhraman, Subhasis Dutta, Tour, Travel

